রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫, ১০:২২:৪৩

সে ভুল ঠিকানায় এসেছিলে

সে ভুল ঠিকানায় এসেছিলে

পাঠকই লেখক ডেস্ক : বিশাল নিজের ঘরে হতভম্ব হয়ে বসে আছে। হতভম্ব হয়ে বসে থাকার পেছনে একটা মারাত্বক কারণ আছে। কোথা হতে একটা মেয়ে এসেছে, এসে বলছে সে নাকি বিশালের প্রেমিকা, বিশালের জন্য সে বাসা থেকে বের হয়ে এসেছে। মেয়ে থাকে রাজশাহী। রাজশাহীর মেয়ের সাথে বিশালের লিংক কিভাবে হল, সেটা ভাবতে ভাবতে বিশালের মায়ের মাথা খারাপ করে ফেলেছেন। বিশাল হতভম্ব, কারণ সে মেয়েটাকে চিনে না। একটা সুন্দর মেয়ে এসে যদি বলে, বিশাল আমি তোমার কাছে চলে এসেছি, আমাকে তোমার কাছে রাখবে না? কেমন লাগবে?

তুই মেয়েটাকে কি বের করবি নাকি আমি পুলিশ ডাকবো?
বিশালের মা এ নিয়ে তিনবার এলেন। উনি প্রচন্ড রেগে আছেন। রাগলে উনি লাল হয়ে যান, আজ টমেটো হয়ে গেছেন। বিশাল কি যেন ভাবে। তারপর মা কে কথাটা বলেই ফেলে।
মা তোমাকে টমেটোর মত লাগছে। এত রাগের কিছু হয় নি।

আমি কিন্তু এবার গ্যান্জাম লাগাবো বিশাল! তুই বলিশ তুই মেয়েটাকে চিনিস না। আবার মেয়েটা কে নিয়ে তুই কথা বলছিস। ওর পক্ষে হয়ে। আমি তাহলে ধরে নিবো যে মেয়েটা যা বলছে সব সত্যি?
কিছুই সত্যি না। কাহিনী হচ্ছে মেয়েটা ঠিকানা ভুল করেছে। যখন ভুল কেটে যাবে, একাই চলে যাবে। তোমার গ্যান্জাম করার দরকার নেই।
এখন আমাকে তুই কি করতে বলিস?
কিছুই করতে বলিনি। তুমি কি খেয়েছো?

বিশালের মা কিছু বললেন না। উনি কিছু খান নি। আস্তে আস্তে উনার লাল রঙ কমে যাচ্ছে। বিশাল মুচকি হাসে। বিশালের মা বাচ্চা বাচ্চা বিহেভ করেন খুব। আগে বাবা সামলাতো, এখন ছেলে সামলায়। বাবার সাথে খুব রাগ করতেন উনি। বিশালের বাবা তখন তার রাগ কমানোর জন্য কত কিছু করতেন! একবার বিশালের স্কুলের সামনে হাটু গেড়ে বসিয়ে তাকে দিয়ে সরি বলিয়েছিলেন। বিশালের সেই দিনের কথা এখনও মনে আছে।
এখন কি তুই চাস আমি মাছ মাংস দিয়ে ভাত খাই? আমি টেনশনে বাঁচি না, আর এই ছেলে বলে...

মা তুমি টেবিলে বসো গিয়ে। আমি আসছি। মেয়েটাকে বলো টেবিলে গিয়ে বসতে। আমারও ক্ষুধা লেগেছে।
বিশালের মা এবার হতভম্ব হয়ে গেছেন ছেলের কথা শুনে। এই ছেলে খালি খাই খাই করছে কেন? ও কি অতি সুখে আছে? মানুষ অতি সুখে থাকলে বেশি খায়। বিশালের বাবা যখন ছিল, তখন উনার এটা ওটা খেতে ইচ্ছা করতো। এখন করে না।

বিশাল তার মা কে তার ঘরে রেখেই বাইরে চলে আসে। গেস্ট রুমে বসে থাকা মেয়েটার সাথে কথা বলা দরকার। একা একা মেয়েটা কি বোর হচ্ছে? মনে হয়। মেয়েটা টিভি দেখছে না। চুপচাপ বসে আছে হয়তো। মানুৃষ অনেক সাহস দেখায় অনেক কাজে। কিন্তু অন্যের বাড়ির টিভি অন করে দেখার সাহস অনেকের নেই। টিভি কেউ চালু করে দিয়ে গেলে সাহস বেড়ে যায় অনেক। তড়তড় করে। তখন মুখের উপর বলে, এটা দেখবো না। বেবি ডল দেখলাম মনে হয় আগের চ্যানেলে। ওইটা দিন।

গেস্ট রুমে গিয়ে দেখা গেল, মেয়ে একা না। কাজের মেয়ে ফরিদার সাথে খুব হেসে হেসে গল্প করছে মেয়েটা। ফরিদা হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। এই মেয়েটা অল্পতেই ভয়ানক খুশি। খাবারের শেষে কারোও প্লেটে যদি এক পিস মাংস থেকে যায়, ফরিদা খুব খুশি। সেই মাংস মুখে নিয়ে চিবুতে পারলে সে আরও খুশি। বিশাল কে দেখে ফরিদা এক ঝটকায় উঠে, দৌড়ে বিশালের সামনে গিয়ে দাড়ায়।
ভাইয়া, ভাবির সাথে গল্প করতেসিলাম। ভাবিরে যতটা ম্যাদা ভাবসিলাম ভাবি সেরম না।

উনাকে ভাবি কেন ডাকছো? আজব তো!
যতই বলেন, ভাবিরে আমার ভাল্লাগসে। আপনেরা কি গপ্প করবেন? চা দিমু? ভাবির সাথে বইসা বইসা চা খাবেন ভাইজান?
তুমি সবসময় বেশি বুঝ ফরিদা! এতদিনেও কিছু শিখো নাই। অবিবাহিত একটা মেয়েকে ভাবি ভাবি করছো। দিস ইস টু ভেরি ভেরি মাচ! তোমার চাকরি খাওয়ার টাইম হয়ে গেছে।

ফরিদা আশাহত কাজের মেয়েদের মত করে বিশালের দিকে তাকিয়ে আছে। সে কি এমন করলো যে তার চাকরি খেয়ে দেয়া হবে? সে তো বিশালের পক্ষে! বিশালের মা চান যে মেয়েটাকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হোক। সেখানে মেয়েটিকে ভাবি বানিয়ে ফরিদা মেয়েটির এ বাড়িতে থাকার একটা পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করছে। বিশালের তো তার হয়ে কথা বলার কথা। তা না, চাকরি খাবে।
এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? যাও টেবিলে খাবার দাও, মেয়েটাকে আসতে বল। কি যেন নাম বলেছিলো.
নামটা বহুত কঠিন। তাই ভাবি ডাকসি। আমার চাকরি কি সত্যি খাবেন ভাইজান?

তোমার চাকরি মসলাপাতি দিয়ে ভুনা করে দিলেও খাবো না, যাও। এখন যাও তাকে ডাকো।
ভাবিরে কি ডাকুম? মিনয়ি আপা? ভাইজান আমি উনাকে ভাবি ডাকসি, এখন আবার আপা কি করে ডাকি বলেন তো?
তুমি অনেক বেশি কথা বল! যাও তোমার ডাকা লাগবে না, আমিই ডেকে দিচ্ছি।
ফরিদার চোখ খুশিতে চিকচিক করছে। এই মেয়ে খুব খুশি হয়েছে মনে হয় বিশালের কথা শুনে। সে তিড়িং তিড়িং করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
বিশাল গেস্ট রুমে ঢুকলো।

মৃন্ময়ী ঘরে বসে বসে টিভি দেখছিলো। পরে আধা ঘন্টা ফরিদার সাথে কথা বলে জানতে পারলো অনেক কথা। অনেক কথাই সে বিশালের সাথে মেলাতে পারে না। বিশাল এমন না। ও অন্যরকম।
মৃন্ময়ী।
হুম?
বাসা থেকে বের হয়ে এসেছো কখন?
সকালে।

সারাদিন কিছু খেয়েছো?
না। এক প্যাকেট চিপস খেয়েছিলাম।
এখন কিছু খাবে? খাবার দিতে বলি?
তুমি এভাবে তো কথা বল না বিশাল!
কিভাবে কথা বলি?
তোমার কথা বলার ধরন বদলে গেছে।

আমি এভাবেই কথা বলি। বাদ দাও। খাবার দিতে বলেছি, খাবে চল। এক প্যাকেট চিপস খেয়ে কতক্ষন থাকবে?
মৃন্ময়ী কেন যেন অবাক হয়ে বিশালের দিকে তাকিয়ে আছে। বিশাল এই চাহনির মানে বুঝে। মেয়েটাকে অনেকক্ষন বুঝানো হয়েছে যে সে তার বিশাল না। কিন্তু সে বিশ্বাস করেনি। এখন মনে হয় করছে। পদ্ধতি কাজে লাগছে দেখে বিশালের ভালো লাগার কথা। কিন্তু বিশালের ভালো লাগে না। কেন যেন জিনিসটা ওর খারাপ লাগছে।
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>><<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<
খাবার টেবিলে খাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কিছু ই শোনা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে মশা উড়ে যাচ্ছে। ফরিদা আজ এরোসল দেয় নি। খাওয়ার মাঝখানে মশার জ্বালা খুব বড় জ্বালা।
বিশাল খুব তৃপ্তি নিয়ে ভাত খাচ্ছে। আজ রান্না খুব ভালো হয়েছে। মাংসের রেজালাটা সে দুই বার নিয়েছে। শুধু ডালে লবন কম হয়েছে।
লবন টা একটু দিবে?

কথাটা শুনে হা হয়ে গেছেন বিশালের মা। বিশাল মেয়েটাকে লবন দিতে বলছে। মায়ের সামনে কত বড় বেয়াদবি!
মৃন্ময়ী লবনের বাটি এগিয়ে দিল।
দৃশ্যটা দেখে মনে হয় ফরিদা খুব খুশি হয়েছে। সে অদ্ভুত শব্দ করে হাসছে। মশাগুলো ঘর থেকে পালিয়েছে। ফরিদা হাসুক।
কিন্তু বিশালের মা একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। তিনি খাবার রেখে উঠে দাড়ালেন , তারপর বিশালের সামনে গিয়ে লবনের বাটিটা হাতে নিয়ে আছাড় মারলেন। ফরিদা চুপ হয়ে গেল। মৃন্ময়ীর খাওয়া বন্ধ।
অনেক হল! খুব মজা নিয়েছিস। এই মেয়েটাকে খাইয়েই বাসা থেকে তাড়াবি। না হলে আমি চলে যাবো . . .
কথাগুলো বলতে বলতে তিনি কান্না শুরু করলেন। বিশাল মাংস চাবাতে চাবাতে মায়ের কাজ দেখছে। মাঝে মাঝে বিহেভ খুব বেশি বাচ্চাদের মত হয়ে যায় তার।

বিশালের মা চলে যেতেই বিশাল আবার খাওয়া শুরু করলো। ফরিদা মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে বললো, ভাবি আপনে খান। আম্মায় এমনই। আপনে আবার ভয় পাইয়া যাইয়েন গা না। আপনে চুপ কইরা থাকবেন। ভাইজানে সব সামলায়। হিনিই সামলাবেন।
ফরিদা তুমি চুপ কর। ওকে খেতে দাও। মৃন্ময়ী তুমি খাও। মাংসের রেজালাটা খুব মজা হয়েছে।
কথাটা বলেই বিশাল উঠে গেল। ফরিদা আবার খুব খুশি। বিশালের প্লেটে মাংসের রেজালার দুই টুকরা রয়েছে। সে এক টুকরা মাংস মুখে পুরে নিয়ে কচকচ করে মাংস চিবুতে লাগলো। মৃন্ময়ী ফরিদার এহেন কান্ডে অবাক হয়ে গেল। সেও তার দেখাদেখি মাংস চিবুতে লাগল। কচকচ করে।
বিশাল তার মায়ের ঘরে গিয়ে দেখে, তিনি বিশালের বাবার ছবি কোলে নিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করছেন। বিশাল আস্তে করে মায়ের সামনে বসে পড়ে।

তুমি এমন কেন করলে মা?
কেন করলাম? আমার কাছে লবন চাইলে কি হত? তুই ওই মেয়ের কাছে লবন চাইতে গেলি কেন? এক দিনে এতদুর হ্যা?
মহিলার মুখের কথায় বাচ্চা বাচ্চা টান। বিশালের খুব মায়া হয়। সে মায়ের সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়ে। নিজের কান ধরে। তারপর বলে, আর এমন হবে না মা। সরি! এরপর আমি শুধু তোমার কাছেই লবন চাইব।
এই এই . বলে মহিলা তার ছেলেকে তুললেন।

কি করিস? তুই তোর বাবার মত হয়েছিস কিছুটা। তবে পুরোপুরি হতে পারিস নি। উনি হলে হাতে করে খাবার নিয়ে আসতেন।
বিশালের খুব খারাপ লাগে কথাটা শুনে। বিশালের মা আবার কান্না করতে লাগলেন। বিশাল খুব কষ্ট করে মা কে থামিয়ে, তারপর তার খাবার খেতে আবার খাবার ঘরে গেল। ফরিদা কে দিয়ে মায়ের ঘরে খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ফরিদা!
জ্বে ভাইজান?
আমার প্লেটের মাংস কই?
ফরিদা থতমত খেয়ে গেছে। এভাবে সে ধরা পড়ে যাবে, ভাবতে পারেনি।
ফরিদা তুমি মাংস খেয়েছ?

ভাইজান আমি মাংস খাই নাই।
তোমার ভাবি কে বলি? সে কিন্তু সাক্ষি দিবে। খেয়েছ?
হ খাইসি।
কেন খেলে?
আপনে যে বললেন মাংস মজা হইসে, তাই খাইয়া দেখতে গেসিলাম।
আমারটাই খাওয়া লাগবে?
ফরিদা নাক টানছে। দৃশ্যটা মৃন্ময়ীর খুব ভাল লাগে। তার কাছে ফরিদা আর বিশালের ব্যাপারটা খুব ভাল লাগছে। অন্যরকম এই বিশালকে ও খুব ভাল লাগছে ওর। সে এতক্ষনে বুঝতে পেরেছে, সে ভুল ঠিকানায় এসেছে। খাবার খেয়েই রওনা দিবে মৃন্ময়ী।
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>><<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<
মৃন্ময়ীর জন্য যে ঘরটা দেয়া হয়েছে, সেটা মৃন্ময়ীর ভালো লেগেছে। ঢাকা শহরে এমন চাঁদের আলোয় ভর্তি ঘর খুব একটা দেখা যায় না। রাজশাহীতে দেখা যায়। ঘরের লাইট নিভালেও চাঁদের আলোয় ঘর আলোকিত। ঘরের এক কোণে প্লাস্টিকের ফুলভর্তি ফুলদানি। বিছানার চাদরেও ফুলের ছবি। মৃন্ময়ীর খুব ভালো লাগে।

ফরিদা হাতে এরোসল নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মৃন্ময়ী হাসছে দেখে সেও হাসছে। ফরিদার হাসি রোগ আছে, কাউকে হাসতে দেখলে সেও হাসে। কোন চোর বিশালের বাসায় চুরি করে যদি হাসে, সেই হাসি দেখলে ফরিদাও হাসবে।
ফরিদা যতই তার ‘ মিনয়ি ভাবি ’ কে দেখে, ততই তার ভালো লাগে। বিশাল ভাইয়ের সাথে তাকে খুব মানাবে।
মৃন্ময়ী ফরিদার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফরিদাকে দেখে, ওকে ভেতরে আসতে বলে।
কি দেখছিলে?

আপনারে ভাবি। চান্দের আলোয় আপনের মুখ ঝিলিক পাড়তেসে। খুব সুন্দর লাগে! কথাটা বলেই ফরিদা মুখ টিপে হাসতে লাগল।
তুমি কি ঘরে এরোসল দিতে এসেছ ফরিদা?
হ। এই এলাকায় জন্মের মশা। বজ্জাতগুলা পাঁচ তলার মাইনষেরেও কামড়ায়। এইডা তিন তলা। আরোও কামড়াইবো। আপনারে পাইলে খুশি হইয়া যাইবো!

এরোসল মারার দরকার নেই। আমি মশারি লাগাবো।
আইচ্ছা।
আর তোমার ভাইয়াকে বলে দিবে যে আমি খুব সকালেই চলে যাবো।
আইচ্ছা।
তোমার কথা খুব মনে পড়বে ফরিদা! তোমার মত কাজের লোক যেন সবার ঘরে থাকে।
আইচ্ছা।

তোমাকে কাজের লোক বলায় কি রাগ হচ্ছে?
একটু একটু হইতাসে।
সরি। তোমার মত একটা মেয়ে যেন আমার ঘরে হয়। যে কিনা সবসময় হাসে। তোমার মত।
আইচ্ছা।

ফরিদা হাসতে হাসতে ঘর থেকে চলে গেল। মিনয়ি ভাবি কি সুন্দর কথা বলে। বিশাল ভাইয়ের কপাল যে পুড়লো, সেটা ফরিদা ভুলে গিয়ে হাসছে।
মৃন্ময়ী চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। খোলা জানালা দিয়ে অপূর্ব জোসনা এসে পড়ছে। চাঁদ জিনিসটার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। এটা একই সময় মন ভালো করে দিতে পারে। আবার মন খারাপও করে দিতে পারে। এই ক্ষমতাটা সূর্যের নেই। অথচ চাঁদ কিন্তু চলে সূর্যের আলো ধার করে। একজনের ক্ষমতা ধার করে কি নিজের ভেতর আরেক ক্ষমতা তৈরি করা যায়? হয়তো যায়। চাঁদের আলোয় মৃন্ময়ীর নেশা নেশা লাগছে। মনে হচ্ছে সে মাতলামি শুরু করবে একটু পরেই, হাসবে মাতাল হাসি।

আসতে পারি?
‘ কে ’ বলে ধড়ফড় করে উঠে মৃন্ময়ী।
আমি বিশাল। আসবো?
জ্বি আসুন।
বিশাল ঘরে প্রবেশ করে। এই ঘরটা তার, এটা সে মৃন্ময়ীকে জানায় নি। আসলে কেন যেন জানাতে ইচ্ছে হয় নি। কিন্তু মেয়েটার ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, মেয়েটার এই ঘরটা পছন্দ হয়েছে। মেয়েটাকে বিশালের জানাতে ইচ্ছে করছে যে ঘরটা তার।
আপনার মোবাইলের চার্জ হয়ে গেছে। এই নিন।

থ্যাংক ইউ।
ঘরটা ভালো লেগেছে?
জ্বি। খুব সুন্দর, পরিপাটি।
ঘরটা আমার। আপনাকে গেস্ট রুমে থাকার ব্যাবস্থা করতাম, কিন্তু আম্মু আপনাকে গেস্ট রুমে উঠাতে মানা করেছেন।
ও।

কিছু লাগলে বলতে পারেন।
মশারিটা লাগাতে সাহায্য করবেন? ফরিদা হুট করে চলে গেল।
ও ঘরে এরোসল দিয়ে যায় নি?
আমি মানা করেছি। আমার সাথে মশারি আছে। মশারি বের করছি।
মেয়েটা তার ব্যাগ থেকে মশারিটা বের করতে লাগলো। মশারিটা দিয়ে কতগুলো টাকার বান্ডিল আর গয়না পেচানো ছিল। সেগুলো ছাড়াতে লাগলো মৃন্ময়ী।

মৃন্ময়ী আর বিশাল মশারি লাগাচ্ছে। এই বাসায় এর আগে কখনোও মশারি লাগানো হয়নি বিধায় ঘরে মশারি লাগানোর ব্যাবস্থা নেই। মশারি লাগানো নিয়ে তাই বেশ যুদ্ধ হল। তারপরেও মশারি লাগিয়ে দেখা গেল, খুব খারাপ মশারি লাগানো হয়েছে।
শুয়ে পড়ুন।
একটা কথা ছিল।
বলুন।
আমি খুব সকালে চলে যাবো।
খুব সকালে কেন?

রাজশাহীর ট্রেন ছাড়ে সকাল ছয়টায়। টিকিট কাটতে হবে।
ও। এখন তাহলে বিশ্বাস হচ্ছে যে আমি আপনার বিশাল না?
আগেই বুঝেছি। এখন জানালাম। পারলে এখনই চলে যেতাম। কিন্তু পড়েছি বিশালের হাতে, থেকে যেতে হবে রাতে!
মেয়েটা খিল খিল করে হেসে উঠে। বিশাল একটু হেসে হাসির উত্তর দেয়। হাসির বদলে সেরা উত্তর হাসি।
ঢাকায় এলেন, যার জন্য এলেন তার সাথে দেখা করবেন না?
ঠিকানা তো ভুল নিয়ে এসেছি।

আপনাদের না মোবাইলে প্রেম? মোবাইল নাম্বারও নেই?
আছে। কিন্তু আমার মোবাইলে টাকা নেই।
একটা ফোন করুন না হয় আমার মোবাইল দিয়ে। আমার মোবাইলে ব্যালেন্স আছে।
কথাটা শুনে বিশালের মনে হল, মৃন্ময়ী খুব খুশি হয়েছে। খুশিতে ওর চোখ মুখ সব ঝিকিমিকি করছে। মেয়েরা খুশি হলে মনে হয় ওদের চোখ মুখ ঝলকায়। ফরিদার সবচেয়ে বেশি ঝলকায়। মৃন্ময়ী বাসায় যখন এসে ঢুকে, তখন বিশালের মায়েরও একই অবস্থা হয়েছিল। পরে মৃন্ময়ীর পালিয়ে আসার খবর শুনে চোখেমুখে আসা সেই ঝিকিমিকি ভাব চলে গিয়েছিল।

মেয়েটা বিশালের ফোন দিয়ে বিশালকে ফোন দিচ্ছে। খুব মনোযোগের সাথে মোবাইলে নাম্বার ঠুকেছে সে। এবার ভুল করলে, জগতে প্রচলিত ‘ মানুষ মাত্রই ভুল করে ’ কথাটা পরিবর্তিত হয়ে ‘ মৃন্ময়ী মাত্রই ভুল করে ’ হয়ে যাবে। মোবাইল কয়েকবার বাজতেই এক মহিলা ফোন রিসিভ করে। কন্ঠ শুনে মনে হয় বিশালের মা।
হ্যালো, ক্যাডা?
আমি মৃন্ময়ী বলছি। বিশালকে দেয়া যাবে?

এত রাইতে ওর সাথে কি?
একটু দরকার ছিল।
ও ঘুমায়। সকালে ফোন দিয়েন।
আপনি কে বলছিলেন?
আমি হেতির উয়াইফ।
স্ত্রী?

জ্বে। ইংলিশে বললাম। ইংলিশ বুঝেন নাই?
জ্বি বুঝেছি। বিশালকে বলবেন খুব দরকার ছিল।
কি দরকার?
বলবেন, ওনার গার্লফ্রেন্ড মৃন্ময়ী রাজশাহী থেকে তার কথামত তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছে। হাতের কাছে কিছু গয়না ছিল, তাও নিয়ে এসেছে। সে যেন আমার সাথে কিছুক্ষনের মধ্যে কমলাপুর স্টেশনের সামনে দেখা করে। ও যে ঠিকানা দিয়েছে সেটা ভুল। প্লিজ একটু তারাতারি জানান। আর গার্লফ্রেন্ড মানে প্রেমিকা।

মৃন্ময়ী ফোন কেটে দেয়। বিশাল কাছেই ছিল। ওপাশের কথাগুলো সব শুনেছে সে। থিউরি অনুযায়ী মেয়েটার মন খারাপ হয়ে যাওয়ার কথা। চেহারা হয়ে যাওয়ার কথা বাংলার পাঁচের মত। কিন্তু মেয়েটাকে অস্বাভাবিক রকমের খুশি দেখাচ্ছে। এত আনন্দ কিসের?
মেয়েটা হুট করেই তার ব্যাগ গুছাতে লাগলো। টাকা আর গয়না এমনভাবে রাখলো, যে ব্যাগের চেন খুললেই আগে টাকা আর গয়না দেখা যাবে। মনে হবে ব্যাগ ভর্তি টাকা আর গয়না।
মৃন্ময়ী বিশালের দিকে তাকায়।
‘ একটা রিকসা ডেকে দিবেন? ’
>>>>>>>>>>>>>>>><<<<<<<<<<<<<<<<<<<
রাত বাজে তিনটার বেশি। ফার্মগেট থেকে গুলিস্তান যাওয়ার জন্য বিলাসবহুল রিকসা নেয়া হল। মৃন্ময়ী একা যাচ্ছেনা, বিশালও সাথে যাচ্ছে। এত রাতে মেয়েটাকে তিন লাখ টাকা আর এতগুলো গয়না সাথে একা যেতে দেয়া ঠিক হবে না।
রিকসায় লাগেজ রাখা হয়েছে বেকায়দায়। বিশাল আর মৃন্ময়ী, কেউ ঠিকমত বসতে পারছে না। শেষে বিশাল না পেরে লাগেজটা শুইয়ে দেয়।
একটা কথা বলবো আপনাকে?
বলুন।

আমি প্রথমে আপনাকে তুমি করে বলছিলাম। এখন আপনি করে বলছি। আপনি কি রাগ করছেন?
নাহ! আমিও তো প্রথমে আপনাকে তুমি করে বলছিলাম। এখন আমিও আপনি করে বলছি।
আরেকটা কথা।
জ্বি বলুন।

একটা সময় আপনি এমন এটিটিউড নিচ্ছিলেন, যে মনে হচ্ছিলো যে আপনিই বিশাল। এটা কেন করলেন?
প্রথমত, আপনাকে আমি অনেকবার বুঝিয়েছি যে আমি বিশাল না। আপনি মানতে রাজি হন নি। আপনার অবস্থা ছিল শোচনীয়। সেই সময় একটা আঘাত পেলে আপনি যে কোন একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতেন। তাই ভাবলাম আমি আপনার মত করে চলি। দেখুন, নিজে নিজেই কি সুন্দর বুঝে নিয়েছেন যে আমি আপনার বিশাল নই!
মৃন্ময়ী মুগ্ধ হয়ে শুনে।

আচ্ছা আপনার বিশাল যে বিবাহিত, এটা জেনেও কি আপনার রাগ হচ্ছে না?
না।
আচ্ছা আপনাকে যে এই বিশাল ইচ্ছা করেই একটা ভুল ঠিকানা দিয়েছে আপনাকে, এটা কি আপনি বুঝেছেন?
বুঝেছি।
আচ্ছা আপনি কি বিশালকে কখনও দেখেছেন?
না। কেন?

মোবাইলে প্রেম করে এতদুর চলে গিয়েছেন? পরে যদি ছেলেকে দেখে ভালো না লাগে? যেয়ে যদি দেখেন ছেলের চেহারা গাঁজাখোরের মত?
গাঁজাখোরের চেহারা মানে?
এই চেহারা দুই রকমের। এক, কিছু লোক গাঁজা খেয়ে খেয়ে চেহারার মধ্যে এমন একটা ভাব নিয়ে আসে, যে চেহারা বলছে, ‘ এই দেখো, আমার চেহারা গাঁজাখোরের মত বানিয়ে ফেলেছি! ’ আরেক ভাগ আছে, যারা গাঁজাখোরের মত চেহারা নিয়েই জন্মায়। ফেসবুকে এক লেখক আছে, আমার পরিচিত। নাম ‪আবির আহম্মেদ পিয়াস 1 এই লোক জীবনেও সিগারেট খেয়ে দেখেন নি। অথচ তার চেহারা গাঁজাখোরের মত।
আচ্ছা।

এখন বিশালের চেহারা ভালো না লাগলে কি করবেন? নীতিকথা নীতিকথাই রয়ে যায়, মানুষ আগে চেহারাই দেখে। আপনিও চেহারাই দেখবেন।
ছেলের চেহারা তাহসানের মত হলেও আর চান্স নেই।
তারপরেও, চেহারা দেখলেন খুব খারাপ। তখন কি করবেন?
তখন আপনার সাথে প্রেম করবো।

মেয়েটা খিল খিল করে হেসে উঠে। রিকসাওয়ালা কি ভেবে এদিক ওদিক চায়। বিশাল মৃন্ময়ীর এমন ঠাস ঠাস কথা শুনে চুম মেরে গেল। বিশালের ফরিদার একটা কথা খুব মনে পড়ে। মেয়েটাকে যতটা ম্যাদা মনে হয়েছিল, মেয়ে অতটা ম্যাদা না। মেয়ে যথেষ্ট চালু।
মৃন্ময়ী হাসি হাসি মুখে তার মোবাইলের দিকে তাকায়। একটা মেসেজ। ‘ আমি কমলাপুর স্টেশন। তুমি কই? ’
দুজনেই কমলাপুর এসে পৌছালো। রিকসা ফাকা রাস্তা পেয়ে বাসের গতিতে এগিয়েছে। যতটা দেরিতে আসা হবে ভাবা হয়েছিলো, ততটা দেরী হয়নি। বিশাল রিকসার বিলাসবহুল ভাড়া মেটালো।

কমলাপুর স্টেশনে ঠিক উল্টা দৃশ্য। এখানে লোকে গিজগিজ করছে। হাঁটার জন্য একটা ছোট্ট চিপা রাস্তা, রাস্তার দুই ধারে মানুষ শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে ব্যারিকেট দিয়ে রেখেছে। মৃন্ময়ী সামনে সামনে, বিশাল লাগেজ নিয়ে পিছনে পিছনে হেঁটে যেতে লাগলো।
মৃন্ময়ী!
মৃন্ময়ী ঘুড়ে দাঁড়ায়। একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ, আধাপাকা চুল। গায়ে লাল শার্ট, আর সাদা লুঙ্গী। চেহারাভর্তি খোচাখোচা দাড়ি, চোখভর্তি কেতুর নিয়ে মৃন্ময়ীর সামনে দাঁড়িয়ে। বিশাল হা করে লোকটাকে দেখে।

আপনি কি বিশাল?
জ্বি। আপনি?
আমি আমার নাম চেঞ্জ করে, নতুন নাম আপনাকে পরে জানাবো।
লোকটা কথার মানেটা না বুঝেও, বুঝার ভান করে মাথা নাড়াতে লাগলো।
বিশাল একবার মৃন্ময়ীর দিকে তাকায়। মৃন্ময়ী চোখ মুখ কুঁচকিয়ে লোকটাকে দেখছে। লোকটা দাড়ি রাখার চেষ্টা করছে, হয়তো নিজের ভাঙ্গা চোপা লুকানোর জন্য।

বিশাল মুচকি হাসে। ওর প্রয়োজন এবার শেষ। প্রয়োজন থাকলেও কেউ আর এসে বলবেনা, একটু হেল্প করবেন?
বিশাল মৃন্ময়ীর কাছ থেকে বিদায় নিবে এবার।
এবার তাহলে আসি মৃন্ময়ী ম্যাডাম। ভালো থাকবেন।
এখনই চলে যাবেন? মৃন্ময়ীর কন্ঠটা হুট করেই খুব খাদে নেমে যায়।
কেউ আটকালে হয়তো থামতাম। থামানোর জন্য কেউ নেই যে! ... ভালো থাকবেন।
বিশাল হাঁটতে থাকে। ওর বার বার ইচ্ছা হয় পেছনে ঘুরে একটু তাকাবে। তাকালে যদি মৃন্ময়ী দেখে ফেলে? যদি বলে বসে, ‘ কিছু বলবেন? ’ , আর বিশাল তখনই কিছু উল্টাপাল্টা বলে বসে তখন?

থাক, দরকার নেই। কেন যেন বিশালের মনে হচ্ছে, মৃন্ময়ী বিশালের চলে যাওয়া দেখছে। দেখুক, বিশাল ঘুরে দাঁড়াবে না।
এক হাঁটায় বিশাল স্টেশনের বাইরে চলে এল। আজান দিয়েছে দশ পনেরো মিনিট হল। একটা দোকান খুলেছে মনে হয়। দোকানদারের চোখ ঢুলুঢুলু। এটা একটা টেকনিক। কেউ ১০০ টাকার একটা নোট নিয়ে এল, ৪০ বা ৫০ টাকার কিছু কিনলো। সে বাকি টাকা ফেরত পাবে না! যে ভুক্তভোগী, সে বেশি ক্যাচাল করতে পারেনা। তার তাড়া আছে। এত সকালে এদিকটায় মানুষ কম, তাই হাঙ্গামা বাধে না। আর দোকানদারের যুক্তি, ‘ ঘুমের ঘোরে ট্যাকা নিসি বইলা মনে করসেন কোন হুশ নাই না! মাইপা মাইপা টাকা দেন, হেই ট্যাকা ফেরত নেওয়ার ধান্দা? ’

বিশাল মাইপা মাইপা দোকানদারকে ৪০ টাকা দিয়ে একটা আইসক্রিম কিনে। আইসক্রিমের চারিদিকে প্যাচানো কাগজটা খুব ধীরে ধীরে ছিড়তে থাকে সে। মানুষ কষ্ট পেলে তাদের কাজকর্ম ধীর হয়ে যায়। ঘুম আসে দেরীতে, ক্ষুধা লাগে দেরীতে। খাওয়াদাওয়া দেরীতে হয় বলে পায়খানার মত কাজও দেরীতে হয়। বিশালের কি আজ দেরীতে পায়খানা হবে?

দোকানদার দোকান বন্ধ করছে। দোকান সকালে খোলা হয়নি, রাতে দোকান খুলে সারারাত খোলা ছিল দোকান। বিশালের এখন দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়া দেখতেও খুব ভালো লাগছে। আইসক্রিমের স্বাদ কেন যেন মনে হয় অন্যরকম লাগছে বিশালের কাছে।
>>>>>>>>>>>>>>><<<<<<<<<<<<<<<<<<
মৃন্ময়ী বিশালের চলে যাওয়া দেখছে। যতই দেখছে ততই অবাক হচ্ছে। ছেলেটাকে সে খুব বেশি হলে বারো ঘন্টা ধরে চিনে। কিন্তু এখন কেন যেন মৃন্ময়ীর মনে হচ্ছে ...... আসলে কি যে মনে হচ্ছে, মৃন্ময়ী তা নিজেও জানে না।
তুমি ঢাকায় এসেছো, আমাকে জানালে না ...

আগে আপনি আপনার চোখ মুছেন। ইয়াক! কি লেগে আছে চোখে এগুলা?
লোকটা দুই হাত দিয়ে দুই চোখ মুছে, তারপর সেই হাত লুঙ্গীতে মুছে নিলো।
মৃন্ময়ী তুমি জানো না আমি কিরম প্যারায় আছি …
এক মিনিট, আগে বলেন, আপনি কি গাঁজা খান?
বিশাল মাথা নিচু করে থাকে।
বুঝছি। নিন কি বলবেন বলেন।

রাতে… আমার স্ত্রী উঠিয়ে তোমার কথা বললো। তুমি নাকি কমলাপুর স্টেশনে।
হুম।
আমি মাইনকা চিপায় ফাসছি। বুঝছি না কারে সামলামু, তোমাকে না বউ কে?
বাব্বাহ! এখনও আমাকে সামলানোর সাহস দেখাচ্ছেন? ভালোই!
বিশাল আবার চুপ করে যায়।

বয়স কত আপনার? দেখে তো মনে হয় একটুর জন্য মুক্তিযুদ্ধ মিস করেছেন। সেই আপনি কি করে... আমি যে ফোনে আপনাকে ভালোবাসি বলেছি, এটা ভাবতেই আমার কেন যেন বমি পাচ্ছে! ইচ্ছা করছে আপনাকে ইচ্ছামত থাপড়াই। কিন্তু পারছি না। লোকে দেখলে ভাববে মেয়ে বাবাকে মারছে!
মৃন্ময়ী লাগেজটা নিয়ে উল্টা হাঁটতে শুরু করে।
বিশাল হুট করেই মৃন্ময়ীর পা ধরে প্লাটফর্মে বসে পড়ে।

মৃন্ময়ী , অন্তত ওই তিন লাখ টাকা আমারে ধার দাও। আমি আমার বউকে সামলাই। আমার আমও যাবে গা, ছালাও যাবে গা! আমারে দোয়া কর ...
মৃন্ময়ী প্রচন্ড রাগে বিশালের বুকে একটা লাথি বসিয়ে দেয়। বিশাল লাথির চোটে প্লাটফর্মে পড়ে যায়। মৃন্ময়ী নিজেও পড়ে যায় টাল রাখতে না পেরে। বিশাল আবার উঠেই এবার মৃন্ময়ীর পা জাপটে ধরে। মৃন্ময়ী একটার পর একটা ঘুসি মারতে থাকে বিশালকে। ছাড় আমাকে গাঁজাখোরের বাচ্চা, ছাড়!

ঘুসির তোড়ে বিশাল মৃন্ময়ীকে ছেড়ে দেয়। ছাড়া পেয়েই মৃন্ময়ী লাগেজ নিয়ে দৌড়! এক দৌড়ে স্টেশনের বাইরে। এদিকে ভেতরের মানুষেরা সব হা করে দেখলো সব। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, মেয়েটা কি পাগল? নিজের বাপকে কেউ এভাবে ঘুসায়?
স্টেশনের বাইরে এসে মৃন্ময়ী বিশালকে খুজতে থাকে। বিশাল বেশিদুর যায় নি। দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা দোকান বন্ধ হয়ে যেতে দেখছে। এমনভাবে দেখছে যেন এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর নেই। বিশালের হাতের আইসক্রিম গলে গিয়ে বিশালের হাত ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সেদিকে বিশালের হুশ নেই। মৃন্ময়ী হাসফাস করতে করতে লাগেজ নিয়ে বিশালের সামনে গিয়ে দাড়ালো।
আপনি? রাজশাহীর টিকেট পান নি?

মৃন্ময়ী হাপাচ্ছে। সে দেখে, খুশিতে বিশালের চোখ চিকচিক করছে। বিশাল জানে, এতক্ষন আইসক্রিমের স্বাদ একরকম লেগেছে, এখন আরেকরকম লাগবে। বিশাল তারাতারি তার আইসক্রিমে কামড় বসায়।
রাজশাহী আজ যাবো না। কাল বা পরশু যাবো। ...... একটু পানি খাবো। খাওয়াবে?
আবার তুমি?
হু। ...... আচ্ছা পানি পরে খাবো। এখন বাসে উঠি। তোমাদের বাসায় যাবো। ঘুম পাচ্ছে। মারামারি করে ক্লান্ত।
মারামারি?
বাসায় গিয়ে সব বলবো। ফরিদার সামনে। ...... আচ্ছা তোমার আম্মু কি রাগ করবেন আমাকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে গেলে?
অবশ্যই।
তাহলে?

মা সবসময় রাগ করে। আমি একা বাসায় গেলে বলতো, ‘ মেয়েটাকে এত সকালে পাঠিয়ে দিলি? ’ বলে রাগ। এখন সাথে করে নিয়ে যাবো, বলবে, ‘ নিয়ে গেলি, আবার ফেরত নিয়ে এলি? ’ বলে রাগ!
মৃন্ময়ী হাসতে থাকে খিল খিল করে। বিশাল হাসির উত্তরে আইসক্রিমে কামড় বসায়।
আচ্ছা, তাহলে তোমার আম্মুকে কি বলবে?
বিশাল লাগেজ নিতে নিতে বললো, ‘ বলবো, মৃন্ময়ী মাত্রই ভুল করে। ভুল করে ওর মশারি আমাদের বাসায় রেখে গিয়েছে। ’
মৃন্ময়ী আসলেই মশারি রেখে গিয়েছে। সে যে ভুলটা ইচ্ছা করেই করেছে, বিশাল কি তা বুঝলো?

লেখক : আবির আহম্মেদ পিয়াস
২৪ ডিসেম্বর ২০১৪/এমটিনিউজ২৪/এসএস/এসবি

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে